শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:২৮ অপরাহ্ন

৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ : লালমনিরহাটে প্রকল্পের উন্নত প্রযুক্তির পাটবীজ ও সার বিতরণ শেষ হয়নি!

নতুন বাংলার সংবাদ
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০২১
  • ২৯০ বার দেখা হয়েছে
ছবি: সংগৃহীত

আসাদুল ইসলাম সবুজ ॥ বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাট অধিদপ্তরের উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেন সরকার। তবে ফাগুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে পাটের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। পাট বীজ বপন করার এ নিয়ম থাকলেও সেখানে জৈষ্ঠ্যমাসেও পাট চাষীদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ শেষ করতে পারেনি লালমনিরহাট পাট প্রকল্প সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তাছাড়া এ প্রকল্পে বেশ অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে জেলার ৩টি উপজেলার উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তারা বিরুদ্ধে। যা তদন্ত করলে প্রমাণ মিলবে, এ প্রকল্পে কি পরিমাণ অনিয়ম করছে উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তারা।

পাট অধিদপ্তর সুত্র জানান, ২০১৯ সাল থেকে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলা ও ২টি পৌরসভার হাজারও চাষীকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাট অধিদপ্তরের উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট ও পাটবীজ উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেন সরকার। এবারেও চলতি পাট মৌসুমে সম্প্রসারণ প্রকল্পে আওতাধীন লালমনিরহাটে সাড়ে ৯ হাজার পাট চাষী নির্ধারণ করা হয়। এতে সাড়ে ৯ হাজার কেজি উন্নতমানের পাট বীজ ও রাসায়নিক সারের বিপরীদে ১৯ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেন। জনপ্রতি পাটচাষী ১ কেজি উন্নতমানে পাট বীজ, সেই সাথে ৬ কেজি ইউরিয়া, ৩ কেজি টিএসপি ও ৩ কেজি এমওপি সার পাওয়ার কথা। এসব সার সরকার অনুমোদিত সার ডিলারের নিকট থেকে ক্রয় করে চাষীদের হাতে সঠিক সময় পৌঁছাতে হবে। কারণ ফাগুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হলেও জৈষ্ঠ্যমাসেও পাট চাষীদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ শেষ করতে পারেনি তারা। এখনও কোন কোন ইউনিয়নে বিতরণ চলছে।

এ বিষয়ে একজন কৃষিবীদ বলেন, ফাগুনের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপনের একেবারে সঠিক সময়। সঠিক পদ্ধতিতে বীজ বপন ও পরিচর্যা করতে পারলে মিলবে পাট চাষে সফলতা। চৈত্র মাসের পরে যদি কেউ পাট বীজ বপন করেন সেখানে যতই পরিচর্যা করুক না কেন আশানুরুপ সফলতা পাবে না।

এদিকে লালমনিরহাট সদর উপজেলাসহ একটি পৌরসভা মিলে ২ হাজার ৩শ চাষীর মধ্যে ৩শ জন পাট বীজ উৎপাদনকারী চাষী জন্য রাসায়নিক সারের বিপরীদে ৪ লক্ষ ৭৪ হাজার টাকা। আদিতমারী উপজেলায় ২ হাজার পাট চাষীর জন্য ৪ লক্ষ ১৪ হাজার। কালীগঞ্জ উপজেলা ২ হাজার ২শ চাষীর মধ্যে ২শ জন পাট বীজ উৎপাদনকারী জন্য ৪ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা। হাতীবান্ধা উপজেলায় ১ হাজার ৫শ জন চাষীর জন্য ৩ লক্ষ ১০ হাজার টাকা এবং পাটগ্রাম উপজেলা ও পৌরসভায় ১ হাজার ৫শ কৃষকের জন্য ৩ লক্ষ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বেশ অনিয়ম-দুর্নীতির জড়িয়ে পড়েছেন জেলার ৩টি উপজেলায় উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তারা। এরা হলেন, বিগত বছরে পাট বীজ ও সার বিতরণে অনিয়মে অভিযুক্ত কালীগঞ্জ উপজেলার উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম ও পাটগ্রাম উপজেলার উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তা আবু হাসান, হাতীবান্ধা উপজেলার উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম।

পাট বীজ ও সার বিতরণ কাগজ কলমে ঠিক-ঠাক রাখা হলেও কিছু কিছু ইউনিয়নে চাষীদের নামের তালিকায় বেশিভাগ ভুয়া পাট চাষীর নামে-বেনামে বীজ ও সার বিতরণে দেখিয়ে তা কর্তকর্তারা নিজেরাই আতœসাত করছেন। তাছাড়াও তালিকায় নাম থাকলে দেওয়া হয়নি বীজ ও সার। আর যারা সার পেয়েছে তাদের ওজনে কম দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সাল পাটগ্রাম উপজেলার উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তা আবু হাসান ভুয়া পাট চাষীদের নামের তালিকা তৈরি করে তা আতœসাত করায় উপজেলা কমিটির নিকট ধরা পড়ে যান। পরর্বতীতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের হাতপা ধরে মাপ চেয়ে বেচে যান। তাদের বিরুদ্ধে বার বার একই অভিযোগ উঠলেও কেউ কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করায় অনিয়ম ও দুর্নীতি এ প্রকল্পে বাড়ছে।

একটি বিশ্বাস্থ্য সুত্র জানান, উপজেলায় উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা কার্যালয় থাকলেও সব সময় থাকে তালাবন্ধ। তাদের কার্যক্রমের কোন তথ্য সংবাদকর্মী বা পাটচাষীরা জানেন না। তারা তাদের খেয়াল খুশি মত কার্যক্রম করেন। লালমনিরহাট জেলার ৫ উপজেলায় কর্মরত উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তারা বাড়ি পাশের জেলা কুড়িগ্রামে। তাই তারা বাড়িতে থেকে অফিস করেন। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া অফিস আসেন না।

প্রয়োজনে কোন চাষী মোবাইলে যোগাযোগ করলে তারা বাড়িতে থেকে বলেন, মাঠে কাজ করছি। অথচ প্রকল্পের বাহিরে আর এক দেড় মাসের মধ্যে এ অঞ্চলের পাট কাটা শুরু করবে চাষীরা। ফলে অনেক পাট চাষীরা সরকারের উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর পাট চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে কৃষি বান্ধব এসরকারে সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।

অপরদিকে পাটবীজ ও সার বিতরণে অনিয়মে অভিযোগ এনে কালীগঞ্জ উপজেলায় পাট কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা পাট কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ করেন একই উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের ৯জন পাট চাষী। শুধু এবারে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগে নয়, ২০২০ সালেও তার বিরুদ্ধে এ প্রকল্পে বীজ ও সার আতœসাতের অভিযোগ হলেও তা রহস্যজনক কারণে তদন্ত হয়নি।

অভিযোগকারী কাকিনা ইউনিয়নের পাট চাষী অনিল চন্দ্র ও মোবারক হোসেন বলেন, পাটবীজ ও সার বিতরণের তালিকায় আমাদের নাম আছে কিন্তু আমরা কোন পাটবীজ ও সার পাইনি। আমাদের মত অনেক পাটচাষীর নাম দিয়ে কর্মকর্তা তা আতœসাত করেছে। তাই আমরা অভিযোগ করেছি।

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আঃ মান্নান বলেন, উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি অভিযোগটি খতিয়ে দেখছি।

অভিযুক্ত ৩ উপজেলার উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, আমরা কমিটির মাধ্যমে পাট বীজ ও সার বিতরণ করেছি। ভুয়া চাষীর নাম ও ওজনে সার কম দেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিতরণকৃত পাট চাষীদের নামের তালিকা চাওয়া হলে তা তাদের কাছে নেই, ঢাকা ও জেলা অফিসে জমা দিয়েছেন বলে জানান।

এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা আঃ সাত্তারের সাথে যোগাযোগ করে পাটবীজ, সার, উৎপাদন এবং সম্প্রসারণ প্রকল্পের বিতরণকৃত চাষীদের তালিকা চাওয়ার হলে তিনি বলেন, সব উপজেলার চাষীদের তালিকা হাতে পাইনি। এবার বিতরণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জেলা পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা আরও বলেন, পাট চাষীর প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতিতে কোন উপ-সহকারী পাট কর্মকর্তারা জড়িত থাকলে পাট অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by RJ Ranzit
themesba-lates1749691102