শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:১৯ পূর্বাহ্ন

লালমনিরহাটের শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল শিক্ষার্থীর হাতের লেখায় শিল্পের ছোয়া !

আসাদুল ইসলাম সবুজ ॥
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২২
  • ১০৯ বার দেখা হয়েছে
লালমনিরহাটের শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। শুধু লালমনিরহাট জেলার নয়, বাহিরের জেলা থেকেও এখানে পড়তে আসে অনেক শিক্ষার্থী।ছবি : নতুন বাংলার সংবাদ

বর্তমান সরকারের দিন বদলের হাওয়ার সাথে শিক্ষার হাওয়াও বদলে গেছে শিবরাম স্কুলে। ফলে আজকাল শহর কিংবা গ্রামের বেশির ভাগ বাবা-মা’র সন্তানদের ভালো ফলাফলের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে লালমনিরহাটের শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। শুধু লালমনিরহাট জেলার নয়, বাহিরের জেলা থেকেও এখানে পড়তে আসে অনেক শিক্ষার্থী।তাদের জন্য এখানে রয়েছে শিশু বান্ধব পরিবেশে আবাসিক ব্যবস্থা। আবাসিক ছাত্রদের মাতৃছায়ার পরশে দেখাশোনা, থাকা-খাওয়াসহ লেখা পড়ার গুরুভার দায়িত্ব নিয়ে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে বিদ্যালয়টি।

বর্তমানে অন্যন্য বিদ্যালয়ের ‘পড়ালেখার মান’ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুললেও সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে, শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে। দুষ্ট অমনোযোগী ও মোবাইল প্রেমী কোমলমতি সোনামনি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটাতে বিদ্যালয়ের নানা উদ্যোগ বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। এ বিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা একই রকম। সবার হাতের লেখা সুন্দর এবং বেশ পরিপাটি। দিন দিন হাতের লেখাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সব শিক্ষার্থীর হাতের লেখার ধরণ একই রকম হওয়ায় অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের নজর কেড়েছে।

জানা গেছে, জার্মানিতে শুরু হওয়া ফ্রোয়েবল কর্তৃক প্রবর্তিত কিন্ডারগার্টেন পদ্ধতির মাধ্যমে চলছে এ বিদ্যালয়। তার সাথে যুক্ত বিযুক্ত হয়েছে আরও অনেক নিয়ম। ফলে অন্যান্য বিদ্যালয় থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি স্বতন্ত্র। ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে সংযুক্ত হচ্ছে ক্যাডেট কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি। ক্যাডেট কলেজ এর আদলে চলবে এ বিদ্যালয়। ক্যাডেট কলেজে ভর্তির নির্ভরযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পুরোদমে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে লালমনিরহাটের মাটিতে পদার্পণ করে বর্তমান জেলা শহরের প্রাণ কেন্দ্র মিশন মোড় সার্কিট হাউজ রোডস্থ শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ। পাশাপাশি ২টি ক্যাম্পাসে শ্রেণি কক্ষ ১৮ টি, তাছাড়াও আছে আবাসিক ভবন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থীর মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন ১৯ জন সহকারী শিক্ষক। আনন্দ আড্ডায় দিনভর পাঠদান চলে এ স্কুলে। প্লে থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠদান সকাল ৮টায় ৪৫মি: থেকে ১১টায় ৪৫মি: পর্যন্ত। তারপর ১৫ মি: টিফিন (বিরতী) হয়ে এরপর শুরু হয় অতিরিক্ত পাঠদান, চলে ১২টা: থেকে ১টা: পর্যন্ত। কিছুটা বেড়ে উঠা সোনামনিদের জন্য পাঠদান পদ্ধতি একটু আলাদা ৩য় থেকে ৮ম শ্রেণি পাঠদান সকাল ৮টা ৪৫ মি: থেকে ১টা পর্যন্ত। তারপর ২ ঘন্টা বিরতি হয়ে এরপর শুরু হয় বিকেল ৩ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত অতিরিক্ত পাঠদান।অতিরিক্ত পাঠদানের সময় স্কুলের পড়া স্কুলেই সমাপ্ত হয় এ স্কুলে। বিদ্যালয়ে দেখা যায়, এ বিদ্যালয়ের স্থানীয় শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের নিয়মিত পাঠদান শেষে বাসায় যায় ঠিকই; কিন্তু আবারও তারা পড়তে আসে বিকেল কিংবা সন্ধ্যা বেলায়। এখানকার শিক্ষার্থীদের বাহিরে কোন প্রাইভেট বা কোচিং এ পড়ার প্রয়োজন হয় না।

বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে পুরো ক্যাম্পাসের প্রাচীরে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, মনীষীদ নারী, দেশের বীর সৃষ্টি সন্তানদের ছবি যেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও জ্ঞান পিপাসু মানুষকে মুগ্ধ করছে। দুষ্ট অমনোযোগী কোমলমতি সোনামনি’র শিশুদের মেধা বিকাশ, জ্ঞান-শৃঙ্খলা, আচার-আচরণের সাথে বেড়ে উঠার লক্ষে বিদ্যালয়ের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে সময় উপযোগী বিভিন্ন দেয়াল লিখন। দেশ প্রেমের চেতনাকে বুকে ধারন করে ঊজ্জ্বল ভবিষ্যত গঠনের দৃঢ় প্রত্যয়ে বিদ্যালয়ের মাঠে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমবেত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে দিনব্যাপী পাঠদান কর্মসূচী শুরু হয়। জাতীয় সঙ্গীত শেষে সারি বন্ধ ভাবে ক্লাসে অভিভাবকদের উপস্থিতিতে তাদের সন্তানদের গভীর মমতায় বুকে জড়িয়ে নেন শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের শ্রেণি কক্ষের শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়ের গেটে সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একজন গেটম্যানের পাহাড়ায় শুরু হয় প্লে থেকে ৮ম শ্রেণির পাঠদান কার্যক্রম। দুষ্ট অমনোযোগী কোমলমতি সোনামনি ছেলে মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন ছাত্র সমন্বয়কারী (আয়া) আছেন। যারা সব সময় ছোট সোনামনিদের বিভিন্ন খাবার ও খেলনা প্রদান সহ গতিবিধি লক্ষ্য রেখে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষককে অবগত করেন। তাছাড়াও শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের নিকট দেয়া ও ক্লাসরুমে নেয়া, চক, খাতা, কলম সহ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট যাতায়াত, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, বেসিন হাত ধোয়া সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকেন। ডে-কেয়ার মত অনাবাসিক শিশুদেরও এ বিদ্যালয়ে দেখভালের জন্য এখানে শিশু বান্ধব আবাসিক ব্যসবস্থা রয়েছে।

শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ সুত্র জানান, এ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় ২০১৬ইং সালে ৯ জন পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহন করে। এতে ৭ জন এ+, ২ জন এ- ও ৩ জন বৃত্তি প্রাপ্ত হন। ২০১৭ইং সালে ২১ জন পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহন করে। এতে ১৯ জন এ+, ২ জন এ- ও ১৪ জন বৃত্তি প্রাপ্ত হন। ২০১৮ইং সালে ২৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহন করে। এতে ২২ জন এ+, ৩ জন এ- ও ১৭ জন বৃত্তি প্রাপ্ত হন। ২০১৯ইং সালে ৫০ জন পরীক্ষার্থী অংশ গ্রহন করে। এতে ৪৮ জন এ+, ২ জন এ- ও ২৩ জন বৃত্তি প্রাপ্ত হন। ২০২০ ইং সালে ৫৬ জন ও ২০২১ ইং সালে ৬০ জন পরীক্ষার্থীকে কোভিড-১৯ এর কারণে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়। বর্তমান চলতি ২০২২ শিক্ষাবর্ষে আবাসিক অনাবাসিক মিলে ২৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠদানে অংশ নিচ্ছেন। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়ালেখার পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য, বাদ্যযন্ত্র, কবিতা, ছড়া, সাধারণ জ্ঞান, শরীরচর্চা, বির্তক সভা, অভিনয়, খেলাধূলা সহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করা হয়।

জাতীয় দিবসে জেলা পর্যায়ে ২০১৯ সালে ২৬শে মার্চ এ ডিসপ্লে প্রতিযোগীতায় ১ম স্থান, ১৬ই ডিসেম্বর জেলা পর্যায়ে ২য় স্থান, ২০১৯ সালে লালমনিরহাট হানাদার মুক্ত দিবসে ৩য় স্থান ও ২০২০ সালে মহান স্বাধীনতা দিবসে জেলা পর্যায়ে আবারও ১ম স্থান দখল করেন বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। যার কারণে বাংলাদেশের বে-সরকারী জনপ্রিয় নিউজ চ্যানেল, যমুনা টিভি, মাই টিভি ও এশিয়ান টিভিতে শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সাফল্য প্রতিবেদ তুলে ধরেছেন। শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের এসব সাফল্যের পিছনে আছেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মোঃ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ।

তার কাছে ক্যাডেট প্রস্তুতি বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক জানান, শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর পার করার পরপরই অভিভাবকদের মনে জায়গা করে বসে বহুল আকাঙ্খিত স্বপ্ন ‘ক্যাডেট কলেজ’। শিক্ষার্থীদের সেই খাকি পোশাক পরিধানের স্বপ্ন পূরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের মূল লক্ষ্যই হলো প্রাথমিক পর্যায়ে থেকে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্যাডেট কলেজে ভর্তির উপযোগী করে গড়ে তোলা।

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ আরো জানান, এখানকার শিক্ষার্থীদের বাহিরে কোন প্রাইভেট বা কোচিং এ পড়ার প্রয়োজন হয় না। সকাল-বিকাল অতিরিক্ত পাঠদানে পিছিয়ে যাওয়া পড়ালেখা সম্পন্ন করা হয়। বিগত বছর গুলোর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় এ বিদ্যালয় থেকে গড়ে ৯৫ ভাগ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ সহ বৃত্তিপ্রাপ্ত হয়ে সাফল্যের শীর্ষ স্থান দখল করেছে। এ ছাড়াও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় শিবরাম আদর্শ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের ছিনিয়ে এনেছে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় পুরষ্কার। শিক্ষার্থী-শিক্ষক, অভিভাবকদের সম্পর্ককে আরো বেশী শক্তিশালী ও দৃঢ় করার লক্ষ্যে পারিবারিক ভাবে একজন সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে বাবা-মায় পাইলটের ভূমিকা রাখেন।

অভিভাবকরা বলেন, শিবরাম বিদ্যালয় সত্যিই অসাধারণ কাজ করেছে। স্কুলের দেয়ালে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও মনীষীদের বাণী লেখা হয়েছে। বাচ্চারা যেন পড়ায় মনোযোগী হয় সে কারণে নানা আয়োজনও রয়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড, ধর্মীয় এবং মানবীয় গুণাবলীতে বেড়ে উঠে ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এখন শুধু লালমনিরহাট জেলার নয়, জেলার বাহিরে থেকেও এখানে পড়তে আসে অনেক শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে বিদ্যালয়টির প্রধান

উপদেষ্টা মোড়ল হুমায়ুন কবির জানান, বিদ্যালয়টিকে আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। বিদ্যালয় যাতে শিশুদের উপযোগী ও আকর্ষণীয় হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে চেষ্টা করেছি কাজ করার। তাই প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পড়াশোনার খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। আর এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটি সহযোগিতা করেছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by RJ Ranzit
themesba-lates1749691102