বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ০৪:২০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ইলিয়াস মোল্লা’কেই পুনরায় চেয়ারম্যান হিসেবে চায় লাউকাঠী ইউনিয়নবাসী শিক্ষার্থীদের ধাওয়া খেয়ে ভোঁ-দৌড় দিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা! লালমনিরহাটে পানির নিচে কৃষকের স্বপ্নের ধান! হাতীবান্ধায় ন্যাশনাল ব্যাংকের করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ভুট্টাক্ষেতে মিলল স্কুলছাত্রীর মরদেহ তিস্তা বাঁচাও ভাঙ্গন ঠেকাও শীর্ষক তিস্তা কনভেনশন কাজীর কান্ড! কাবিননামা নিতে ৩০ হাজার টাকা দাবি মাদক ব্যবসায়ীদের ছুরিকাঘাতে দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত! লালমনিরহাটে বিএনপির বাইসাইকেল র‍্যালিতে মির্জা ফখরুল লালমনিরহাটে অস্ত্রসহ ৪ জন জনতার হাতে আটক।। পুলিশে সোপর্দ

মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আজ : বইছিল স্বাধীনতার সুবাতাস

নতুন বাংলার সংবাদ
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২২
  • ১৩৫ বার দেখা হয়েছে

বইছিল স্বাধীনতার সুবাতাস। স্লোগানে মুখরিত চারিদিক, আকাশ-বাতাস, জোর গলায় উচ্চারিত হচ্ছে, ‘জয় বাংলা’, তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর জুড়ে যেন অনুরণিত হয়ে চলেছে, প্রতিধ্বনিতে একাকার হালকা শীতের আমেজময় সেই ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ সাল। বেলা দ্বিপ্রহরের পরপরই হাজার দশেকেরও বেশি সদ্য মুক্তির স্বাদ পাওয়া আবেগে উদ্বেলিত বাঙালি সেখানে জড়ো হয়েছিলেন, যদিও তারা জানতেন জাতির জনক সেখানে এসে পৌঁছবেন বিকেলে। রুদ্ধশ্বাসে সেখানে প্রতীক্ষায় রয়েছেন সকলেই, প্রতীক্ষায় সেই মহানায়কের, যিনি এই মাটির স্বাধীনতা এনেছেন, যার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আর উদাত্ত আহ্বানে সকলে নেমেছিলেন মুক্তি ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে। শত ত্যাগ তিতিক্ষা, অশ্রুপাত, রক্তপাত, মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এনেছেন সকলে। সেই মহানায়ককে নিজ দেশের মাটিতে স্বাগতম জানাতে। অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দাঁড়ানো লাইনে সকলের মুখে উৎকণ্ঠা, অস্থিরতা যারা যুদ্ধ করেছিলেন, গঠন করেছিলেন যুদ্ধকালীন সেই মুজিবনগর সরকার। তরুণ ছাত্রনেতাদের মধ্যেও আবেগাপ্লুত অধীরতা, যাদের সকলের অগাধ দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত যুগ যুগ ধরে জাতির অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সকলেই তাদের হৃদয়ের বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষায়।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আসা কমেট বিমানটি যে মুহূর্তে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করলো, যেন কোনো জাদুময় কিছু ঘটে গেলো। প্রতীক্ষাধীন লাখো জনতা যেন অপেক্ষা করে ছিল অনন্তকালের জন্য, তার সমাপ্তি ঘটলো। শেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বঙ্গবন্ধু তাঁর নতুন মহিমায় এলেন, এ যেন, ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’। ‘ভদ্র মহোদয়গণ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, আমি জীবিত এবং সুস্থ’, বাংলার সেই নেতা বললেন আনন্দিত স্বরে, নানা মিথ্যা অপপ্রচারের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘পাকিস্তানের বন্দি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল তাঁর বন্দিদশার দিনগুলোতে। তিনি দেশে ফেরার দু’দিন আগে লন্ডনের ক্লারিজেস এ একটি জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। জানুয়ারির ৮ তারিখে পাকিস্তানের নতুন নেতা তাকে পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির চাকালা বিমানবন্দরে বিদায় জানান।

বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে উড্ডয়নের পর, ভুট্টো মন্তব্য করেছিলেন, ‘দ্য নাইটিঙ্গেল হ্যাজ ফ্লোউন’। অবতরণের পরে বঙ্গবন্ধুকে দেখে মনে হচ্ছিল অনেক ক্লেদাক্ত দীর্ঘ ১০ মাস পাকিস্তানে বন্দিদশায় কাটাবার ক্লান্তির ছাপ। আর উৎসুক জনতার উচ্ছ্বাসে, উল্লাসে আর গগন ফাঁটা জয়োল্লাস ও অভিবাদনে তিনি স্পষ্টতই বিহবল হয়ে পড়েন। তাঁকে একাত্তরের মার্চে যখন পাকিস্তানে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় সে সময়ের তুলনায় বেশ শীর্ণকায় হয়ে গিয়েছিলেন। এলোমেলো, উস্কোখুস্কো চুল আর মুখে লেগে থাকা অদ্বিতীয় স্মিতহাসি, কপালে লেপ্টে থাকা চুলের মধ্যে তিনি আলতো হাত বুলিয়ে ঠিক করছিলেন। সারা শরীরে অবসাদের চিহ্ন। তবে চোখে দৃঢ় প্রত্যয় আর অদ্ভুত দীপ্তি যা জনতার মনোযোগের কেন্দ্রে।

তিনি কাঁদছিলেন। জনসমক্ষে বা বিশ্ববাসীর সামনে প্রথমবারের মতো ছলছল করে অশ্রুসিক্ত হয়ে তিনি কাঁদছিলেন। বিগত নয় মাসে বাংলাদেশ ও তার জনগণের উপর যে বীভৎস জুলুম, অত্যাচার গিয়েছে তার স্মরণ করে তিনি কাঁদছিলেন। তাঁর সাথে কাঁদছিল উপস্থিত জনতাও। সাত কোটি জনতা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে এতদিন শঙ্কিত ছিল। তারা এতদিন কত না প্রার্থনা করেছে আবার নিজেদের মাঝে ফিরে পাবার, নিরাপদে ফিরে আসার জন্য। এর কয়েক ঘণ্টা আগে, তিনি দিল্লিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভ্যর্থনা লাভ করেন। সাত কোটি বাঙালি প্রত্যক্ষ করলেন তাদের জাতির জনক রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হবার আগে গার্ড অব অনার পরিদর্শন করলেন। রেসকোর্সের সেই ঐতিহাসিক স্থান যেখানে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছিল তাঁর অমোঘ ৭ই মার্চের উত্তাল ভাষণ।

বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ট্রাকটি ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্সের এই স্বল্প দৈর্ঘের রাস্তাঘাট জনমানুষের সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। মানুষের মনে আনন্দ যেন আর ধরে না। প্রতিটি ছাদের উপরে আনন্দিত মুখের প্রতিচ্ছবি—নারী, পুরুষ আর শিশুর। কিশোর-তরুণরা আশপাশের গাছগুলোতে চড়ে বসেছিল এই জয়োৎসব প্রত্যক্ষ করতে। সবার সংলাপ সীমাবদ্ধ ছিল দুটি সহজ সরল কিন্তু কার্যকর এবং প্রেরণাদায়ক শব্দে। সেই শীতের সন্ধ্যায়, বঙ্গবন্ধু একাত্তরের মার্চের পরে প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশ্যে কথা বলেন। জাতি আগ্রহভরে শ্রবণ করে তার প্রাণ থেকে উঠে আসা কথামালা, যা তারা সবসময়ই করেছে। আবেগে তার গলা ধরে আসছিল, তবে তাঁর বাগ্মী প্রকাশে তা কাটিয়ে যাচ্ছিল। আবারও জাতি একাগ্র আর মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলেন বঙ্গবন্ধুর মোহনীয় বাণী ‘জয় বাংলা’। সদ্য স্বাধীন বাংলার মাটিতে বইছিল স্বাধীনতার সুবাতাস। কিন্তু সেই সুবাতাসে বাঙালি জাতি যেন একজনের অভাব বোধ করছিল। বুঝতে দেরি হলো না আসলে সেই অভাবটা। আসলে স্বাধীনতার রূপকার, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশের জাতির জনক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মহান নেতা বঙ্গবন্ধুইতো নেই। সদ্য স্বাধীন বাংলার মাটিতে সেদিন এই মহান নেতার অনুপস্থিতি বঞ্চিত করে পূর্ণ সাত কোটি বাঙালির বিজয়ের স্বাদ আস্বাদনে।

ভয়াল ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখে হানাদার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। পরবর্তীতে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও বিদ্রোহে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে বিচারের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ঘোষণাটি ছিল, ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহ্বান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক’।

বিজয়ের পরপর বঙ্গবন্ধুকে বাংলার মাটিতে ফিরে পেতে ব্যাকুল হয়ে উঠে দেশের আপাময় জনসাধারণ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দাবি ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান বাঙালি জাতির জনক। এদিন বঙ্গবন্ধুকে একটি বিশেষ বিমানে তুলে দেওয়া হয় লন্ডনের উদ্দেশ্যে। সকাল সাড়ে ৬টায় তাঁদের বহনকারী বিমানটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বেলা ১০টার পর থেকে তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দিন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেন। ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর একটি বিমানে তিনি পরের দিন ৯ জানুয়ারি দেশের পথে যাত্রা করেন। ১০ তারিখ সকালেই তিনি নামেন দিল্লিতে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র মন্ত্রিসভা, নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি ও সে দেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন। লন্ডন-দিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বেলা ১টা ৪১ মিনিটে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। বাঙালি জাতির পিতা তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা।’

নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করে বীর বাঙালি। স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনো পাকিস্তানের কারাগারে। ফলে স্বাধীনতা এলেও নেতার অনুপস্থিতিতে অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল বিজয়ের গৌরব। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭২ সালের আজকের দিনে (১০ জানুয়ারি) স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখেন মুক্তির মহানায়ক। তার আগমনে পূর্ণতা পায় মহান স্বাধীনতা। সেই থেকে দিনটি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালিত হয়। বঙ্গবন্ধু নিজে তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন- ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে। প্রতি বছর বিস্তারিত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ ও দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করে।

লেখক:
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক ভোরের পাতা, দ্য পিপলস টাইম
সহ-সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগ
সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
পরিচালক, এফবিসিসিআই
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইরান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102