শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

নেশায় যখন বাবা ও মেয়ে’র লাঠি খেলা!

স্টাফ রিপোর্টার ।।
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২২
  • ৩৬ বার দেখা হয়েছে
শুক্রবার সকালে উঠানেই মেয়ে জরিনা আক্তার মিমের সঙ্গে লাঠি খেলতে দেখা যায় নূর ইসলামকে।ছবি : নতুন বাংলার সংবাদ

তিস্তার ভাঙনে জমিজিরাত হারিয়েছেন নূর ইসলাম। দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন সিন্দুর্ণা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী হলেও তিনিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা জীবনের আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন লাঠিখেলায়। দক্ষিণ সিন্দুর্ণা গ্রামের মেম্বারপাড়ার প্রবেশ পথেই বাড়ি তাঁদের।শুক্রবার সকালে উঠানেই মেয়ে জরিনা আক্তার মিমের সঙ্গে লাঠি খেলতে দেখা যায় নূর ইসলামকে।

তাঁর পরিবারের মতো অবস্থা লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুর্ণা ইউনিয়নের ৪নম্বর ওয়ার্ডের এ গ্রামের প্রায় সব পরিবারে। এক-দেড়শ পরিবারের বাস এখানে। জমি চাষ ও অপরের জমিতে শ্রম বিক্রিই জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তবে জীবনের অবলম্বন হয়ে উঠেছে লাঠিখেলা।

লালমনিরহাট জেলা সদর থেকে বুড়িমারী মহাসড়ক ধরে হাতীবান্ধা সদরের মেডিকেল মোড় প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। যেতে লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। সেখান থেকে রিকশা বা ভ্যানে করে যাওয়া যায় তিস্তাপাড়ের পাঠানবাড়ি ঘাটে। খানিকটা হাঁটলেই দক্ষিণ সিন্দুর্ণা গ্রামের মেম্বারপাড়া। সিন্দুর্ণা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটিই হয়ে উঠেছে গ্রাম। নূর ইসলামের বাড়ি ছাড়িয়ে যেতেই নদী পাড়ের বাঁশঝাড়ে ছুটতে দেখা যায় বাকপ্রতিবন্ধী কিশোর রবিউল ইসলামকে। অন্য সবার মতো তাঁর হাতে লাঠি। সেখানে দেখা যায় শিশু-কিশোরদের লাঠিখেলার নিবিড় প্রশিক্ষণে মগ্ন।

কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রবিউলের বাবা আব্দুল হামিদ ও দাদা আব্দুল গফুরও লাঠি খেলতেন। হাঁটতে হাঁটতে কথা হয় স্থানীয় লোকমান হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সাধনা আকতারের সঙ্গে। সে জানায়, তার মা রশিদা প্রতিবন্ধী হলেও লাঠি খেলতেন আগে। বাবা সফিয়ার রহমানেরও বেশ নামডাক ছিল এ খেলায়। কয়েক বছর আগেই তিনি মারা গেছেন। দক্ষিণ সিন্দুর্ণাসহ আশপাশের এলাকায় খেলাটির জনপ্রিয়তার মূল কারিগর মোহাম্মদ কবিরাজ। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপর তিনি ৪০ জনকে নিয়ে দল গঠন করেন। তাঁরাই নিয়মিত চর্চা শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে সেখানে গড়ে ওঠে ‘দি লায়ন লাঠি খেলোয়াড় দল’। পরে এর দায়িত্ব নেন সুযোগ্য শিষ্য নূর আলম। বয়সভিত্তিক ছোট ছোট দল গঠন করে গ্রামের ছেলেমেয়েদের খেলার কায়দা-কসরত শেখান তিনি। সহ¯্রাধিক মানুষ তাঁর কাছ থেকে লাঠিখেলা শিখেছেন।

নূর আলমের সব জমিও গেছে তিস্তার পেটে। এখন ৫ শতকের বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নেই। কষ্টেসৃষ্টে জীবন চালালেও ছাড়েননি লাঠিখেলা। গ্রামের লোকজনকে প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেন। মাঝেমধ্যে দল নিয়ে এলাকার বাইরের নানা অনুষ্ঠানে যান। পৌষ-পার্বণে আশপাশের চরাঞ্চলে যেসব মেলা হয়, সেখানে ডাক পড়ে নূর আলমের দলের। এ ছাড়া বৈশাখী মেলা, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানেও যেতে হয় প্রশাসনের আমন্ত্রণে। এসব অনুষ্ঠানে যে ক্রেস্ট-পদক পাওয়া যায়, তাতেই আনন্দ পান।

নূর আলম বলেন, এলাকার বাইরের অনুষ্ঠানে খুব একটা আয় হয় না। খেলায় গেলে ছেলেমেয়েরা ভালো-মন্দ দুটি খেতে পারে, আনন্দ উপভোগ করে- এটিই তাঁর জন্য বড় পাওয়া। সামান্য যে খরচ পাওয়া যায়, তা আসা-যাওয়াতেই শেষ হয়ে যায় বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, কিছু পাওয়ার জন্য নয়, ভালোবেসে গ্রামের লোকজন লাঠি খেলে। তবে তাঁর ছাত্রদের বেশিরভাগেরই খেলার পোশাক নেই। নিজেদের দলের বাদ্যযন্ত্রও নেই। অনুষ্ঠানের আগে ভাড়া করে আনতে হয়। তিন মেয়ের বাবা নূর আলম।

বড় মেয়ে নূরজাহান আক্তার রানু বলেন, বিয়ের আগে তিনিও লাঠি খেলেছেন। এখন তাঁর ছেলেমেয়েরা খেলে।

মেজো মেয়ে হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজের বিএ (অনার্স) ছাত্রী নূর আক্তার বানু বলেন, তিনি ও অষ্টম শ্রেণিপড়ূয়া ছোট বোন বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে লাঠি খেলায় অংশ নেন। শুক্রবার তিন বছর বয়সী মোহাম্মদ জি এম হোসেনকে দেখা যায় লাঠি ঘোরাতে। ৩ ফুট উচ্চতার এই শিশুর হাতে ২ ফুটের লাঠির ঘূর্ণনে সৃষ্ট বোঁ বোঁ শব্দ মুগ্ধ করে দর্শনার্থীর। সে জানায়, গ্রামের অন্যদের দেখাদেখি সেও শিখে নিয়েছে লাঠিখেলার কৌশল। তার বাবা রাশেদুল ইসলামও আগে খেলতেন।

ছেলে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেখতে ওই গ্রামের সুমি আকতার, শরিফা বেগম ও মৌসুমী জানান, মা হওয়ার আগে তাঁরাও লাঠি খেলেছেন। এখন সন্তানদের খেলা দেখে আনন্দ পান। তিস্তাপাড়ে এ খেলার জনপ্রিয়তার কারণ জানালেন লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য গবেষক নজরুল ইসলাম মন্ডল। প্রাক্তন এই সহযোগী অধ্যাপকের ভাষায়, গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাচীনতম অংশ এই লাঠিখেলা। এর জন্য ব্রিটিশ শাসনামলে সর্ববঙ্গীয় অ্যাসোসিয়েশনও গড়ে উঠেছিল। তাদের উদ্যোগে কলকাতার এক প্রতিযোগিতায় পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ লাঠি খেলোয়াড় পাঁচকড়ি মিত্রকে হারিয়েছিলেন তিস্তাপাড়ের তুষভান্ডার এলাকার রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। তখন থেকে এ অঞ্চলে লাঠিখেলার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মামুন বলেন, হারিয়ে যেতে বসা এ সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখায় তিস্তাপাড়ের মানুষের জন্য গর্ববোধ করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by RJ Ranzit
themesba-lates1749691102