বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন

নেই আর নেই দিয়েই চলছে লালমনিরহাটের ১৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা

নতুন বাংলার সংবাদ
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১
  • ১২৭ বার দেখা হয়েছে
নেই আর নেই দিয়েই চলছে- ২৫০ শষ্যার আধুনিক লালমনিরহাট জেলা হাসপাতাল।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ কাঙ্খিত সেবা নেই, মেডিকেল অফিসার নেই, নার্স নেই, আয়া-ওযার্ড বয় নেই, ঔষধ নেই, আইসিইও নেই, অক্সিজেন ভ্যান্টিলেশন নেই, পৃথক পৃথক ওয়ার্ড নেই, সরকার ঘোষিত বার্ণ ইউনিট নেই, ক্যান্সারইউনিট নেই, কিডনি ডায়ালাসিস ইউনিট নেই, সয়ক্রামণ রোগ ইউনিয়ন নেই, হাসপাতালে ব্লড ব্যাংক নেই, ষি খাওয়া রোগীর ওয়াশ রুম নেই্, বিষাক্ত সাপে কাটা রোগীর ভ্যাকসিন নেই, হাসপাতালে সকল ধরণের অস্ত্রপাচার নেই, একজন করোনা রোগীর প্রতিদিনের খাবারের জন্য ৩০০ টাকা করে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও একজন রোগীকে তিন বেলা যে খাবার দেওয়া হচ্ছে তার বাজারমূল্য ৬০-৭০ টাকা। নেই আর নেই দিয়েই চলছে- ২৫০ শষ্যার আধুনিক লালমনিরহাট জেলা হাসপাতাল।

১০০ শষ্যার হাসপাতালের ষ্টাফপ্যাটান এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ১৭ জন মেডিকেল অফিসারের পদ দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে শূন্য রয়েছে। জেলায় করোনা সংক্রামণ মারাত্নক আকার ধারণ করলেও এ হাসপাতালে কোন নতুন চিকিৎসক যোগদান করেনি। ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছে সর্দি, জ্বর ও ঝরবৃষ্টি জর্ণিত রোগ বালাই। আক্রান্তের বেশিরভাগ বয়ঃবৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী, শিশু। হাসপাতালে প্রতিদিন রোগী ভর্তিও চাপ বেড়ে চলছে। কোন বেড খালি নেই। চলছে মেঝেতে চিকিৎসা। কোভিন- ১৯ রোগীর শ্বাসকষ্টজর্ণিত রোগীর জন্য নেই কোন আইসিইও, অক্সিজেন ভ্যান্টিলেশন। নার্সিং ইনিষ্টিটিউটের নার্সেও আবাসিক কক্ষে অস্থায়ী ভাবে কোভিন হাসপাতাল ঘোষনা দিয়ে দায়সার গোচের চিকিৎসা চলছে। ফলে এখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে।

জানা গেছে, জেলায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় একটি সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক ১২টি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শষ্যার ৫টি, ১০ শষ্যার একটি, মাতৃমঙ্গল ও শিশু কেন্দ্র ১টি। জেলায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অত্যান্ত নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাঙ্গের ছাতার মত অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়োগোনিষ্টিক সেন্টার। এসব ক্লিনিক ও পরীক্ষাগার গুলোতে সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ। লালমানিরহাট সদর হাসপাতালকে ১০০ শষ্যা হতে ২৫০ শষ্যায় ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষনা দেয়। সেই হতে আজ পর্যন্ত এখানে এখনো ১০০ শষ্যার চিকিৎসক প্যাটানে কোন চিকিৎসক ও ষ্টাফ নিয়োগ হয়নি। এখনো ৫০ শষ্যার কর্মকর্তা-কর্মচারি প্যাটানে চলছে। সেই ৫০ শষ্যার প্যাটানেও রয়েছে কর্মকর্তা কর্মচারী সংকট।

জেলা হাসপাতালে ১৭টি মেডিকেল অফিসারের পদে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে শূন্য রয়েছে। কোন মেডিকেল অফিসার ছাড়াই হাসপাতালের জরুরি বিভাগ চলছে সহকারী মেডিকেল অফিসার দিয়ে। কয়েকজন চিকিৎসককে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হতে পেষণে এনে হাসপাতালে জরুরি বিভাগ চলছে। তারও আবার কয়েক জন অন্যত্র বদলি হয়ে চলে গেছে। এই হাসপাতালে কোভিন-১৯ রোগীদের জন্য পৃথক কোন ওয়ার্ড নেই। কেবিনে রেখে চিকিৎসা চলছে। এছাড়াও হাসপাতালের পাশে স্থাপিত সরকারি নাসিং ইননিষ্টিটিউটটিতে নাসৃদেও আবাসিক হলের রুমে ২০শষ্যার করোনারোগীদের সাধারণ চিকিৎসা সেবা দিতে অস্থায়ী হাসপাতাল ঘোষনা করে চিকিৎসা চলছে। এইখানে ১৩জন নতুন চিকিৎসক যোগ দিলেও তারমধ্যে ৪জন চিকিৎস অন্যত্র চলে গেছে।

হাসপাতালে সরকারি নিয়োগ প্রাপ্ত আয়া ও ওয়ার্ডবয় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নেই। চিকিৎসকগণ স্থানীয় জনবল দিয়ে আয়া ও ওয়ার্ড বয়ের কাজ করাচ্ছে। এরা এখানে বিনা বেতনে কাজ করছে। হাসপাতালটিতে ৩য়, ৪র্থ শ্রেণি ও সুপার নেই। তাই হাসপাতালটি কয়লা আবজর্নাদিয়ে ভর্তি। র্দূগন্ধে সেখানে ঠিকা দায়। চিকিৎসা সেবা নেই বললেই চলে। হাসপাতালে আধুনি ডিজিটাল এক্সেওে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট, রক্ত পরীক্ষা এখানে হয় না (সাধারণ লোক দেখানো দুই একটা পরীক্ষা হয়)।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ ১১টি কিন্তু তারা কেউ নিয়মিত হাসপাতালে আসে না। এমন কি তারা লালমনিরহাটে কোথাও প্রাইভেট প্যাকটিস করে না। তারা বিভাগীয় রংপুর শহরে বসবাস করেন। সেখানে তারা নামে বে নামে গড়ে তুলেছেন ক্লিনিক, হাসপাতালা ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। সেখানে নিয়মিত কাজ করেন। শুধুমাত্র বেতন নিতে মাসে দুই একবার হাজিরা দিতে আসেন। হাসপাতালে সকল ধরণের ছোটখাটো অস্ত্রপাচার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দামী ওটি, আলোসোনগ্যাম মেশিন অকেজ হয়ে পড়ে রয়েছে। সরকার ঘোষিত বার্ণ ইউনিট, ক্যান্সারইউনিট, কিডনি ডায়ালাসিস ইউনিট, সয়ক্রামণ রোগ ইউনিয়ন নেই। হাসপাতালে ব্লড ব্যাংক নেই। পৃথক কোন বিষ খাওয়া রোগীর ওয়াশ রুম নেই্, হাসপাতালের বাহিরে কলের পাড়ে প্রকাশ্য ওয়াশ করা হয়। কখনো কখনো হাসপাতালের লাশ রাখার ডিপ ফ্রিজের রুমে বিষখাওয়া রোগীকে ওয়াশ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে বণ্যা জর্নিত সাপে কাটা রোগী আসে। এখানে সেই বিষাক্ত সাপে কাটা রোগীর ভ্যাকসিন নেই। বিষাক্ত সাপে কাটা রোগীর সাপের বিষের ধরণ দেখে পৃথক পৃথক ভ্যাকসিন দিতে হয়। কোন রকমের বা কোন ধরণের ভ্যাকসিন নেই।

অপরদিকে একজন করোনা রোগীর প্রতিদিনের খাবারের জন্য ৩০০ টাকা করে সরকারি বরাদ্দ থাকলেও লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের একজন রোগীকে তিন বেলা যে খাবার দেওয়া হচ্ছে তার বাজারমূল্য ৬০-৭০ টাকার বেশি নয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফলমূল দেওয়া কথা থাকলেও তা পাচ্ছেন না রোগীরা। ফলে অধিকাংশ রোগীকেই বাড়ির খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। খাবার সরবরাহে করোনা ইউনিটে দর্শনার্থীর আনাগোনায় সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।

হাসপাতালাতের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ র্মোশেদ সাওয়ার দোলান জানান, শুক্রবার প্রায় একশত প্লাসরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু রোগীদের কাঙ্খিত সেবা ইচ্ছা থাকলেও দেয়া সম্ভব নয়। এই হাসপাতালে কোন মেডিকেল অফিসার নেই। ১৭টি পদের সব গুলো শূণ্য প্রায় দেড় বছর। সরকারি ভাবে কোন আয়া ও ওযার্ড বয়ের নিয়োগ নেই। বিনা বেতনে স্থানীয় আয়া ও ওয়ার্ড বয়দিয়ে হাসপাতালে কি ধরণের সেবা দেয়া যায় উল্টো প্রশ্ন রাখেন।

ডাঃ র্মোশেদ সাওয়ার দোলান আরও জানান, হাসপাতালের পাশে আড়াইশত শষ্যার হাসপাতালের একটি ৮তল বিল্ডিং প্রায় নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে গণপুর্ত বিভাগ হস্তান্তর করার কথা। সেখানে পৃথক সরকার ঘোষিত ইউনিট গুলো চালু করা যাবে। এই মুহুর্তে হাসপাতালে চিকিৎসক, আয়া ও ওয়ার্ডবয় প্রয়োজন। তা না হলে করোনা পরিস্থিতির বিপর্যয় মোকাবিলা করা খুব কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

সিভিল সার্জন ডাঃ নির্মূলেন্দ্র রায় জানান, জেলায় নতুন করোনা পজিটিভ কেস – ৪১, (সদর-৩৪, আদিতমারী-২, কালিগঞ্জ-১, হাতিবান্ধা-১, পাটগ্রাম-৩)। এ পর্যন্ত রোগী শনাক্ত ১২৬৮, সুস্থ ১০৮১, মোট মৃত-১৮, নমুনা কালেকশন- ৬৮৭২, ফলাফল পাওয়া গেছে ৬৭৩৪। করোনা পরিস্থিতিকে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, মৌসুমী সর্দি জ্বর। পানি বাহিত ও বৃষ্টি জর্ণিত বিভিন্ন রোগ বালাই। হাসপাতালের ইনডোর ও আউট ডোরে প্রতিদিন রোগী সামলানো দায় হয়ে গিয়েছে।

হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ সিরাজুল ইসলাম জানান, করোনা পরিস্থিতি সম্মিলিত ভাবে মোকাবেলা করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে জন সচেতনতার বিকল্প নেই। হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার, আয়া-ওযার্ড বয় নিয়োগ দিতে হবে। তাছাড়া স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় মারাত্নক আকার ধারণ করতে পারে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by RJ Ranzit
themesba-lates1749691102