মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০৬:৩০ পূর্বাহ্ন

চা শ্রমিকদের জীবন সংগ্রাম

নতুন বাংলার সংবাদ
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২২ জুন, ২০২১
  • ১৩৭ বার দেখা হয়েছে
ছবি: সংগৃহীত

লিটন পাঠান, হবিগঞ্জ ।। হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৫টি চা বাগান সুরমা, নোয়াপাড়া, জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া, বৈকুণ্ঠপুর চা বাগান। এগুলো মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত। ৬৫ বছর বয়স্ক সুভাস পানতাতি একসময় এই তেলিয়াপাড়া বাগানে কাজ করতেন। ৩৫ বছর কাজের পর এখন অবসরে। সেখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীতে বসবাস করেন। দীর্ঘ জীবনে দেখেছেন অনেক কিছু। কিন্তু এখনকার পরিবর্তনগুলো তাঁর চোখে পড়ছে। গাঁয়ে এখন পাকা রাস্তা। এই পল্লীর একশ’ পরিবার বছরে চারবার ত্রিশ কেজি করে চাল পান। একশ কর্মহীন মানুষ বছরে পান ছয় হাজার টাকা করে বয়স্ক ভাতা। এসবের জন্য কৃতজ্ঞ তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। বলেন, তাঁর কারণেই আজ আমাদের পরিবারের লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। পুলিশে সেনাবাহিনীতে চাকরি পাচ্ছে। বেড়েছে আমাদের সামাজিক মর্যাদা। এই সবই হয়েছে শেখ হাসিনার কল্যাণে।

কেবল এই তেলিয়াপাড়া চাবাগানেই নয়, প্রতিটি বাগানেই একই রকম দৃশ্য। এখানকার ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠিই এই চা বাগানগুলোর প্রাণ। তাদের শ্রম আর ঘামে মাধবপুর চা দেশের গন্ডি পেরিয়ে রপ্তানী হচ্ছে বিদেশে। এরাই অবদান রাখছে দেশের অর্থনীতিতে। কিন্তু এতগুলো বছর এই চা শ্রমিকদের ভালো-মন্দের দিকে কতটুকু নজর দিয়েছে সরকার? কতটুকু ঘটেছে তাদের জীবন-মানের উন্নতি? কথা হয় চা শিল্পে কাজ করা ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী চা শ্রমিক ও দিনমজুরদের সঙ্গে। তাদের সংসার জীবন, দুঃখ, কষ্ট ও আনন্দানুভূতি উঠে আসে তাদের মুখ থেকেই। ভৌমিক সম্প্রদায় সহ প্রায় ২০-২৫ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চা বাগানে কাজ করেন। এদের অধিকাংশের পূর্বপুরুষের বাস ছিল ভারতে। এই অঞ্চলে বসতি গড়েন তারা একশ/দেড়শ বছর আগে। বছরের পর বছর কষ্টে দিনানিপাত করা এই ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর চা শ্রমিকরা এখন খানিকটা স্বস্তিবোধ করছেন। তারা ভীষণ খুশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের উপর। বৈকুণ্ঠপুর পল্লীতে পাঁচ শতাধিক পরিবারকে এতদিন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে রাস্তা-ঘাট নিয়ে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিতও ছিল যুগের পর যুগ। এখন রাস্তাঘাট পাকা করা হয়েছে। বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সব সুবিধা পাচ্ছে তারা। রেশনিং এর মাধ্যমে পাচ্ছে চাল। শ্রমের মূল্য ৪০-৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা।

আর এ সব সুযোগ পেয়েছেন তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমল থেকে। তাই শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী চা শিল্প শ্রমিকদের। এই প্রাপ্তি যে পর্যাপ্ত, সেটাও অবশ্য বলেন না তারা। সুভাষ পানতাতি বলেন, আমাদের মত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়েজনের তুলনায় এসব পাওয়া কম হলেও আগের সরকারগুলো যেখানে খেয়ালই করতো না, সেখানে এ অল্প সুযোগ পাওয়াও আমাদের জন্য অনেক কিছু! তাই অল্পতেই আমরা সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রীর বদন্যতায় তারা কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও দুঃখ পুরোটা ঘোচেনি। স্বস্তির কথা বলতে গিয়ে মুখে কিছুটা কষ্টের কথাও এসে যায়। সুভাষ পানতাতি বলেন, তাদের দিনে ৮ ঘন্টা চা বাগানে শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে মাত্র ১২০ টাকা তাদের শ্রমের মূল্য। অর্থাৎ, মাসে ৩৬০০ টাকা। যা বর্তমান শ্রমবাজারের তুলনায় রীতিমত অবিশ্বাস্য! তিনি বলেন, পৃথিবীতে আমাদের শ্রমের মূল্যই বোধ করি সবচেয়ে কম ।

তবে অবসরে যাওয়া সুভাষ পানতাতি এককালীন ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা পেয়েছেন চা বাগান কর্তৃপক্ষ থেকে। তিনি বলেন, স্থায়ীভাবে যারা কাজ করেন তারাই কেবল এককালীন এই টাকাটা পেয়ে থাকেন। সেই সঙ্গে সপ্তাহে দেড়শ টাকা পেনশনও পান অবসরে যাওয়া শ্রমিকরা। কেবল এই তেলিয়াপাড়া চা বাগানেই নয়, প্রতিটি বাগানেই একই রকম দৃশ্য। এখানকার ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠিই এই চা বাগানগুলোর প্রাণ। বাগানের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর একজন মতিলাল সাওতাল। নিজেদের জীবনের দুঃখ কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, দুই ছেলে, ছেলের বউ ও পাঁচ নাতি নিয়ে তার সংসার। বড় ছেলে বিজয় কুমার দিনমজুর। ছোট ছেলে মরণ সাওতাল চা বাগানে কাজ করে। সংসারের সদস্য বেশী থাকায় পুরনো ঘরে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। চা বাগান কর্তৃপক্ষের বিধি নিষেধ থাকায় নতুন ঘর তোলার সুযোগ নেই। বাগান কর্তৃপক্ষের ২১ বাই ৯ ফিট ঘরেই জীবন কাটে তাদের ১০ জনের পরিবারের।

তিনি জানান, ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে চা বাগান গড়ে ওঠার সময় যে সকল নিয়ম কার্যকর ছিল তারই ধারাবাহিকতা চলছে এখনো। ব্রিটিশ এরপরে পাকিস্তান পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশ এলেও সেই ব্রিটিশ শাসনেই তারা আছেন। এখানে চা বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কিছুই করার নেই তাদের। এখানে বাঁচতে হবে হয় তাদের নিয়মে, মরতেও অনুসরণ করতে হয় বাগান কর্তৃপক্ষের নিয়ম। এই চা বাগানেরই ছেলে সুমন এখন মাধবপুর মৌলানা আছাদ আলী ডিগ্রী কলেজে অনার্স ক্লাসে পড়েন। মজুরীর ন্যায্য পাওনার দাবি উচ্চারিত হয় তার কণ্ঠে। বলেন, ‘দিনে ১২০ টাকা আয়ে একটা পরিবার কীভাবে চলে? এটা বাগান মালিকরা ভাবে না। এই টাকায় আমাদের অভিভাবকরা কীভাবে খাওয়া দেবেন? কাপড় দেবেন? লেখাপড়া শেখাবেন? যারা লেখাপড়া করার মত মেধা নিয়ে জন্মায়, তারা সেই সুযোগ পায় না। ফলে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তেই হয় সমাজ থেকে। তার দাবী,চা শ্রমিকদের দৈনিক ৩ শ টাকা মজুরী নির্ধারণ করার। এটা হলে তারা কিছুটা সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে বলে জানান।

সুরমা চা বাগান শ্রমিক সরণ কৈরী বলেন, দিনে ১ টাকা ২০ পয়সায় কাজ শুরু করি চা বাগানে। চাকরি যখন ছাড়ি দিনে ১২০ টাকা পেতাম। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সময় ৭৫ হাজার টাকা কল্যাণ তহবিল থেকে নিয়ে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যাই। ৭১ বছর বয়সী আমার স্ত্রী মারা গেছে কিছুদিন আগে। চার মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে এখন এক মেয়ে স্থায়ী নিয়োগে চা শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। দুই ছেলে অস্থায়ীভাবে কাজ করে। তাদের আয়ে কষ্টে সৃষ্টে সংসার চলে। নিজে পাহাড়ে লাকড়ি সংগ্রহ করেন। সরণ কৈরী বলেন, সুরমা চা বাগানে স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে নারী পুরুষ মিলিয়ে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ৫শ মানুষ কাজ করেন। চা বাগানগুলোতে শ্রমিক হিসাবে তাদের চাকরি পাওয়াও এখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগ্যতা থাকলেও শ্রমিক ছাড়া অন্যকোনো পদে চাকরি জোটে না তাদের। শ্রমিকের টাকা হাতিয়ে নেয় বাবুরা। প্রতিটি চা বাগানে একজন ম্যানেজার ও একজন সহকারী ম্যানেজার থাকে। এছাড়াও বাবু পদে থাকে কমপক্ষে ১৮ জন। সর্দার থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী, থাকে জোগালী পদেও। এরপর শ্রমিক। এই অর্গানোগ্রামে একটি বাগান পরিচালিত হয়। বাবু পদে যারা কাজ করেন, তারা মুলত কাজের বন্টন ও তদারকি করেন।

সর্দার পদের যারা, তারা বাবুদের বন্টন করে দেওয়া কাজের বাস্তবায়ন করেন। আলাপকালে বাগান শ্রমিকরা বলেন,তাদের মজুরীতে নানা ছুতোয় ভাগ বসান এই বাবুরা। শ্রমিকদের কাছে বাবুরা রীতিমত আতঙ্ক। চা শ্রমিকরা বাবুদের নাম দিয়েছেন চাঁদাবাজ হিসাবে। স্থায়ী শ্রমিকদের উপর বাবুদের চাঁদাবাজী কিছুটা কম থাকলেও অস্থায়ী শ্রমিকদের উপর নানা উপায়ে চাঁদাবাজি করেন বাবুরা। মাধবপুর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সুলায়মান মুজুমদার বলেন, ইউনিসেফের অর্থায়নে ২০১১ সন থেকে চা বাগানে বিনা মূল্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এখন রাজস্ব খাত থেকে পর্যায়ক্রমে সকল চা শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া চা শ্রমিক সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য উপবৃত্তি সহ শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হচ্ছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by RJ Ranzit
themesba-lates1749691102