সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ০১:২৪ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
ইলিয়াস মোল্লা’কেই পুনরায় চেয়ারম্যান হিসেবে চায় লাউকাঠী ইউনিয়নবাসী শিক্ষার্থীদের ধাওয়া খেয়ে ভোঁ-দৌড় দিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা! লালমনিরহাটে পানির নিচে কৃষকের স্বপ্নের ধান! হাতীবান্ধায় ন্যাশনাল ব্যাংকের করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ভুট্টাক্ষেতে মিলল স্কুলছাত্রীর মরদেহ তিস্তা বাঁচাও ভাঙ্গন ঠেকাও শীর্ষক তিস্তা কনভেনশন কাজীর কান্ড! কাবিননামা নিতে ৩০ হাজার টাকা দাবি মাদক ব্যবসায়ীদের ছুরিকাঘাতে দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত! লালমনিরহাটে বিএনপির বাইসাইকেল র‍্যালিতে মির্জা ফখরুল লালমনিরহাটে অস্ত্রসহ ৪ জন জনতার হাতে আটক।। পুলিশে সোপর্দ

খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : বাড়ছে দ্বিধাদ্বন্দ্বে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা!

বাংলার সংবাদ ডেস্ক ।।
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৪৩ বার দেখা হয়েছে

রোববার (১২ সেপ্টেম্বর) সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে যাবে। এই নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বইছে আনন্দের ফুয়ারা। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংক্রমণ বাড়তে থাকলে আবারও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে দেশের সব বিদ্যাপীঠ। এই সংবাদে জমতে শুরু করেছে সন্দেহের কালো মেঘ। যদিও প্রস্তুতি হিসাবে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাজ সাজ রব, বিরাজ করছে খুশির আমেজ। দেড় বছর পর আবার দেখা হবে প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে বেশ কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

তারা বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় সারাক্ষণই বাসায় থাকছে তার সন্তানরা। আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইল এবং ইন্টারনেটে। মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশুনার ক্ষেত্রেও। সারাক্ষণই ওদের মাথায় থাকে যে কখন মোবাইলটা নিয়ে গেমস খেলতে বসবে। পড়াশুনার কথা বললে বিষয়টি সহজ ভাবে নেয় না।

বাবা-মারা বলছেন, শিশুরা বাসায় থাকলেও নিয়মতান্ত্রিক জীবনে আর অভ্যস্ত নয় তারা। তবে স্কুল খুলে দেয়াতে তাদের সম্মতির কথাও যেমন বলেন, তেমনি সংক্রমণ এখনও আছে সে ভয়টিও তাদের তাড়া করে ফিরছে। শনাক্তের সংখ্যা কমে এলেও তা একেবারে শূন্যের কোঠায় নামেনি। তাই নিজেদের বাচ্চ দের নিয়ে অনেকটা শঙ্কিত এসব অভিভাবকেরা। এসময় তারা সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়টির উপরে জোর দেন। তাদের ভাষায়, স্কুলে পাঠাতে হলে চাই পূর্ণ নিরাপত্তা। শিক্ষার্থীদের টিকার বিয়য়টি নিশ্চিত করে স্কুল খুললে ভালো হতো বলে তারা মত দেন। তবে করোনা সংক্রমণ আবারও বাড়তে থাকলে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মুখে পড়তে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

শুক্রবার রাজধানীর মহাখালীর তিতুমীর সরকারি কলেজে বিডিএস প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, স্কুল খোলার পর আমেরিকায় করোনা সংক্রমণ বেড়েছে, আমাদের এখানেও সংক্রমণ বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প থাকবে না। যদিও আমেরিকা আর আমাদের দেশ এক নয়। তবে করোনা সংক্রমণ বাড়লে আমাদেরকে নিয়ন্ত্রনে উদ্যোগ নিতেই হবে।

১৮ বছরের কম বয়সীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এখনও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে ১৮ বছরের কম বয়সীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে অনুমতি আসেনি। ডব্লিউএইচও অনুমতি দিলে শিশুদের টিকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিশুদের করোনা আক্রান্তের হার এমনিতেও কম বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

কথা হয় কয়েকজন শিক্ষক প্রতিনিধির সঙ্গে। নিজেদের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব শিক্ষক প্রতিনিধিরা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীরা নেমে পড়েছেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কজে। সরকারি নির্দেশনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা শিক্ষার্থীদের সুবিধা এবং স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখছেন সচেতনভাবে। এখন শুধুই অপেক্ষা। তারা দাবি করেন শিক্ষাকে বাঁচাতে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি আমরা রাখব না।

২০২০ সালের মার্চ মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর ওই বছর মে মাসের ৩১ তারিখে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করা শিক্ষার্থীরা কেউই আজ পর্যন্ত কলেজে ক্লাস করতে পারেনি। পরিচিতি হতে পারেনি নতুন সহপাটিদের সঙ্গে। এমনকি দেখা হয়নি কলেজ চত্বর। কথায় আছে নো নলেজ উই দাউট কলেজ। সেই প্রত্যাশার অনুষ্ঠান নবীনবরণ, নতুন বন্ধু, নতুন ক্লাস, নতুন বই, নতুন শিক্ষক সবই তাদের কাছে এখনও অধরাই রয়েে গেছে। হয়েছে শুধুই অনলাইন অভিজ্ঞতা। যাযাবরের সেই ঐতিহাসিক কথা বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ আর কেড়ে নিয়েছে আবেগ।

এমনি একজন শিক্ষার্থী হলিক্রসের একাদশ শ্রেণির পলাশ সরকার। পলাশ মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছে ক্লাস করার জন্য। কলেজ খোলা নিয়ে সে একটু উত্তেজিতও বটে। পলাশ বলেন, অনলাইনে আসলে কোনও ক্লাসই করতাম না। ক্লাসের সময় অনলাইনে অন্য কাজ করতাম। রোল কল হয়ে গেলে আমরা নিজেরা কথা বলতাম। তাই কলেজ খুলে দেয়া এবং আমাদের ক্লাস করাটা খুবই জরুরি হয়ে পেড়েছে।

একই কলেজের শিক্ষার্থী লিংকনের কথায় পাওয়া যায় উল্টো চিত্র। কলেজ খোলার আনন্দ তাকে যেন স্পর্শ করছে না। বরং একটু বিরক্ত। কেন কলেজ খুলছে! কলেজে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। অথচ, কলেজ নিয়ে কতই না স্বপ্ন ছিল। কেন কলেজ যেতে মন চাইছে না, জিজ্ঞেস করলে সে বলে, ‘সকাল বেলা ওঠো, রেডি হও, খাবার খাও এসব ভালো লাগছে না। তার চেয়েও বিরক্ত লাগছে ট্রাফিক জ্যামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার কথা মনে হলে। শেষই তো হয়ে গেছে কলেজ জীবন। অনলাইনে আর যাই হোক এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি।’

রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র সারোয়ার আলম বলে, ‘স্কুল খুলছে ভালো। অনেক খেলব। কিন্তু স্কুল খুললেই তো পরীক্ষা দিতে হবে। এ কথা মনে হলেই কিচ্ছু ভালো লাগে না।’

শিক্ষার্থীদের আচরণে এমন ভিন্নতা প্রসঙ্গে শিশু মনোবিজ্ঞানী (কাউন্সিলর অ্যান্ড সাইকোলজিস্ট) নাসিমা আক্তার বলেন, দীর্ঘ সময় স্কুলের বাইরে থাকার কারণে অনেক শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে। এমন পরিস্থিতি একদিকে যেমন তাদের সঠিক মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে শিশুদের মধ্যে। যা তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

নাসিমা আক্তার বলেন, যে বাচ্চাটা প্রথম শ্রেণিতে পড়তো সে এখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র, আবার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কিছু বুঝতেই পারলো না কলেজের গন্ডিতে পা রাখছে। তারা নিজেদের বড় ভাবতে শুরু করছে। এ অবস্থায় কী আচরণ করবে তা নিয়ে তারা চিন্তিত। তাই মানসিকভাবে অস্থির হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেড় বছরের গ্যাপ বেশ বড় একটা সময়। আর সময়টা আমাদের বা বাচ্চাদের অনুকূলে ছিল না। ভয়-ভীতি-শঙ্কা নিয়ে আমরা চলাফেরা করেছি। এর প্রভাব তো একটু পড়বেই। তবে পরিবারের সমর্থন পেলে সহজেই শিশুরা এটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

তিনি বলেন, আমি এমন একটি পরিবারের কথা জানি, করোনকালের বেশিটা সময় ওই পরিবার জানালাটা পর্যন্ত খোলেনি। বাতাসে করোনাভাইরাস ঢুকে যেতে পারে। ওই পরিবারের বাচ্চারা দৈনন্দিন নিয়মের বাইরে চলে গেছে। তাদের খাওয়া, ঘুম সব ওলট-পালট হয়ে গেছে। এই বাচ্চারাই চট করে নিয়মের মধ্যে আসতে পারছে না। করোনার আগে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বাবা-মা তাদের কাছে এখন আসছেন, সন্তানদের সমস্যা নিয়ে। সন্তানদের প্রযুক্তি আসক্তি বাড়ছে। সন্তানদের মধ্যে আচরণগত নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করার কথাও বলছেন অভিভাবকরা।

এর কারণ হিসেবে এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, করোনার মধ্যে অনেকেই শিশু অবস্থা পার করে কৈশরে পা দিয়েছে। তাদের আচরণগত সমস্যা একটু হতেই পারে। আবার শিশুরা একা একা থাকার ফলে অনেকে প্রচন্ড জেদ করছে, ইমোশনাল রিঅ্যাকশন করছে, কান্নাকাটি করছে কেউ কেউ। এসবই হচ্ছে দীর্ঘদিন একা একা থাকার ফল। বয়সে কিছুটা বড় বা কিশোরদের মধ্যে এই প্রতিক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। কেউ হয়তো জেদ করে কোন কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে, ইন্টারনেট ও মোবাইল ব্যবহার বাড়ছে। একটু বড়রা পরিবারের অন্যদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে, আইসোলেটেড থাকতে পছন্দ করছে, অনেকে ঘরেই বেশি সময় কাটিয়েছে। এ ধরনের আচরণগত পরিবর্তন শিশুদেরকে মহামারি-পরবর্তী জীবনেও তাদের খাপ খাইয়ে নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা প্রথমদিকে কষ্টকর হতে পারি জানিয়ে নাসিমা আক্তার বলেন, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের বিষয়টি মন দিয়ে উপলব্ধি করতে হবে। দীর্ঘ সময়ের করোনা ভাইরাসের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিশুদের মানসিক এবং সামাজিক উন্নয়ন ও বিকাশে বাবা-মাকেই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে। সঙ্গে শিক্ষকদের মানসিক সহযোগিতা অবশ্যই থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন বলেন, শিশু কিশোরদের ‘না’ বলা যাবে না। এ সময় সব শিক্ষার্থীদের পাশে বাবা-মা শিক্ষককে থাকতে হবে। বেশ কিছুদিন তারা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছিল। সময়টা একবারেই কম না। তাই কিছু সমস্যা তো হতেই পারে। বাচ্চাদের মনোজগত বিচিত্র, এটা বুঝেই আমাদের তাদের সঙ্গে আচরণ করতে হবে। যেন তারা সহজেই আগের নিয়মে ফিরে যেতে পারে। একদিকে যেমন তাদের পাশে থাকতে হবে, অন্যদিকে শিশুরা যাতে পরিবারে থেকেই নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

মিরপুর ক্যান্ট. পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক কামরুজ্জামান রনি স্কুল খোলা নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত। এই স্কুলের প্রায় প্রতিটি বাচ্চার সঙ্গে তার সখ্যতা চোখে পড়ার মতো। তিনি বলেন, আমার কলেজের একাদশ শ্রেণির বাচ্চাদের এখনও দেখেনি, একদম শিশু শ্রেণির বাচ্চাদেরও না। সব মিলিয়ে আমরা শিক্ষকরা আমাদের সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি হয়তো আগামীকালই তার অবসান ঘটবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by Freelancer Zone
themesba-lates1749691102