বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ন

অনুমতি ছাড়াই এলজিইডির প্রকৌশলীর চোখ ধাঁ-ধাঁ-লো অফিস ও এসি বিলাস

আসাদুল ইসলাম সবুজ
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২
  • ১০২ বার দেখা হয়েছে

আসাদুল ইসলাম সবুজ ॥ বিশ্বব্যাপী সংকটের কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। সময়সূচি দিয়ে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং এবং সরকারি-বে-সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার চেষ্টা চলছে। যার ধারাবাহিকতায় লালমনিরহাটে বেড়েছে লোডশেডিং। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বন্ধ রাখার বিধান থাকলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) লালমনিরহাটের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফের এসি বিলাস বন্ধ হয়নি। সেই এসি রুমের কক্ষে বসে ঘুষ ছাড়া নড়ে না ঠিকাদারদের ফাইল।

অনুসন্ধানচালিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারী মাসে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন লালমনিরহাটে যোগদান করেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ। তিনি উক্ত অফিসে যোগদানের পর এলজিইডি অফিসে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছে। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এলজিইডি। সারাদেশের স্থানীয় উন্নয়নে এ প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অগ্রণী। অথচ সেই অফিসে কাজ পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়, ওয়ার্ক অর্ডার পেতে ঘুষ দিতে হয়, কাজ বাস্তবায়নের সময় তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে ঘুষ দিতে হয় সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফকে। এক কথায় ঘুষ না দিলে আব্দুল মান্নাফকে টেবিল থেকে কোন ফাইলেই নড়ে না। ফলে উন্নয়ন কাজের গুণগত মান নিয়েও চরম সংশয় দেখা দিয়েছে।

একটি বিশ্বাস্থ্য সুত্র জানান, লালমনিরহাট এলজিইডি ভবনের ২য় তলার একটি কক্ষে বসেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ। সেই কক্ষের সামনে পাহাড়াদার হিসেবে রেখেছেন পিয়ন। সেই পিয়নকে বলা আছে, স্যারের অনুমতি ছাড়া ভিতরে প্রবেশ নিষেধ। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অনুমতি বা সরকারি বরাদ্দ ছাড়াই তার অফিস কক্ষটিকে তিনি বিভিন্ন ভাবে চোখ ধা-ধা-লো হিসেবে সাজিয়েছেন। লাগিয়েছেন ২৪ ঘন্টাই লাইটিং সুবিধাসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি)। এসবেই হয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির টাকায়। তবে সরকারি ভাবে একজন এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী কোন ভাবেই এসি, গাড়ি বা পিয়ন ব্যবহার করতে পারেন না। নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফের এসি লাগানোর ক্ষেত্রে প্রকৌশল দপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হয়। অনুমোদন ছাড়াই এসি ব্যবহারে ক্ষুব্ধ প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অপরদিকে সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফের বিরুদ্ধে সরকারী গাড়ী ব্যবহার নিয়ে নানান আলোচনা সমালোনা সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি ভাবে সহকারী প্রকৌশলীদের নামে কোন গাড়ি বরাদ্দ নেই। অথচ সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ এলজিইডির দুই দুটো গাড়ি বীরদর্পে ব্যবহার করছেন। সেই গাড়ীতে চড়ে লালমনিরহাট থেকে পঞ্চগড়ে প্রতিমাসেই পরিবারকে নিয়ে ১৩৯ কিলোমিটার সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে গ্রামের বাড়িতে যান। আবার সেই সরকারী গাড়িতে চড়ে গ্রামের বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরেন। ওই গাড়িতে চড়ে মাসে মাসে পরিবারসহ রংপুরে শপিং করা, মেয়ের স্কুল যাতায়াত, ব্যক্তিগত কাজে জেলার বাহিরে সফর, রাতে শহরের বিভিন্ন স্থানে অহেতুক ঘোরাঘুরি করেন।

অথচ সরকারী ভাবে নির্বাহী প্রকৌশলীর ১৪০ লিটার জ্বালানি তেল বরাদ্দ থাকলেও সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ একাই শুধুমাত্র চলতি বছরের জুলাই মাসে ৫শ ৬০ লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহার করছেন। যা গাড়িতে রাখা লকবইয়ে প্রমাণ মিলবে। সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফের সরকারি গাড়ি ও এসি বিলাসবহুল জীবন যাপনের আয়ের উৎস কি। এতো বিলাসবহুল জীবন যাপনের অর্থ তার বেতনের টাকায় নয়, অনিয়ম, দুর্নীতির টাকায় চোখ ধাঁ-ধাঁ-লো অফিস কক্ষসহ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) বসিয়েছেন। বানিয়েছেন বাড়ি-গাড়ি, নামে-বেনামে সম্পত্তিসহ কোটি টাকা। যা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে দুর্নীতির বড় রহস্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগী ঠিকাদার বলেন, এলজিইডি অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। আমরা ঠিকাদাররা বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ উন্নয়নকর্মী। আমরা সরকারের সকল প্রকার উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করে থাকি। এসব উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্ত্রী-জায়া-জননীর স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে তারপর রড-সিমেন্ট কিনি, মিস্ত্রির খরচ মেটাই। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে পকেটের টাকা খরচ করে সরকারের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করি। অথচ সেই কাজ বাস্তবায়নের পরে বিল তুলতে গিয়ে ঘাটে ঘাটে আমাদের কড়ায় গন্ডায় ঘুষের পার্সেন্টেজ গুনতে হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপিপন্থী আরেক ভুক্তভোগী ঠিকাদার বলেন, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে ঘুষ না দিলে ফাইলে নড়ে না। এ কারণে ঠিকাদারি পেশা থেকে এখন সরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার দৌরাত্মে শুধুমাত্র সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যহত হচ্ছে তা নয়, সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট করছে আপদমস্তক দুর্নীতি গ্রস্ত এসব অসাধু কর্মকর্তারা। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা এ বিষয়ে সুদৃষ্টি দেবেন।

সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এলজিইডি লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর কাদের ইসলাম কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2017 notun-bdsangbad
Design & Developed by RJ Ranzit
themesba-lates1749691102